Cookie Policy          New Registration / Members Sign In
PrabashiPost.Com PrabashiPost.Com

লন্ডনে বিবেকানন্দ

প্রথমবার বিলেতে এসে বিবেকানন্দ শুনিয়েছিলেন বেদান্তের বাণী, সহনশীল, উদার, প্লুরালিস্টিক হিন্দুধর্মের সার মর্ম - যত মত তত পথ ।

সুচেতনা সরকার
Sun, Feb 9 2014

About সুচেতনা

পেশায় ফিজিক্সের হাইস্কুল শিক্ষিকা, আর নেশা অসংখ্য - গান শোনা, রান্নাবান্না, সুযোগ পেলেই বেড়ানো, ফুলের বাগান সাজান, লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লেখা আর সবচেয়ে বড় নেশা হল ইতিহাস । পেশার সূত্রে বিলিতি সমাজটাকে মাটির কাছ থেকে দুচোখ ভরে দেখার সুযোগ জীবনকে চিনিয়েছে বহুমাত্রিক ভাবে । আর ইতিহাসের সাথে অভিজ্ঞতার বুনন মাঝে মাঝে কলম কালিতে এঁকে নেওয়াটা স্বপ্ন হয়ে জমে রয়েছে মনের মাঝে ।


More in Culture

Happy Colours of Life

Durga Puja in London: The UnMissables

Mahishasura Mardini

একা বোকা

 
১৮৯৫ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর । সাইক্লোন সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ এসেছেন লন্ডনে । টেমস শহর এর আগে অনেক নামী অনামী ভারতীয়কে দেখেছে । অভুক্ত, পরাধীন, হীনমন্যতার ভারতবর্ষ থেকে এর আগে এমন স্বাভিমানী, যুক্তিবাদী, দার্শনিক, আত্মবিশ্বাসী এবং দারিদ্রবিক্রেতা নয় এমন মানুষ তাদের আগে বড় চোখে পড়েনি ।

অথবা তিনি কোনো ইন্ডিয়ান প্রিন্স বা রাজপুত্রও নন, রাণীর দরবারে মণিমুক্তো, টাকাপয়সা ছড়াতেও আসেননি- গেরুয়া পরা ভিক্ষু তিনি, যেন ভগবান বুদ্ধ স্বয়ং ! শুধু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন ‘একটি গন্ডুষ জল’ ! এই দুর্গম যাত্রায় সঙ্গী কেবল বেদান্তের বাণী, সহনশীল, উদার, প্লুরালিস্টিক হিন্দুধর্মের সার মর্ম, “যত মত তত পথ” ! এমন অদ্ভুত কথা এদেশে কেউ আগে কখনো শোনেনি যে ! তাই তো তাঁর ভাষণ শুনতে ভেঙে পড়ত তখনকার লন্ডনের শিক্ষিত সমাজ ।

তাঁর প্রথম সফরে বিবেকানন্দ বিলেতে ছিলেন ২৭শে নভেম্বর পর্যন্ত । তারপরে আরো দুবার ব্রিটেনে আসেন তিনি – একবার ১৮৯৬-তে আরেকবার ১৮৯৯ সালে আমেরিকা যাওয়ার পথে ।

এখানেই দেখা হয়েছিল ম্যাক্স মূলার, পল ডসন, মার্গারেট নোবল, লেডি ইসাবেলা মার্গেসন, সেভিয়ার দম্পতি এছাড়া আরো অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিত্ত্বের সঙ্গে । ক্যানন উইলবারফোর্স বেদান্ত ভাষণে মুগ্ধ অভিভূত হয়ে অভিজাত ওয়েস্টমিনিস্টারে তাঁর বাড়িতে ডিনারে আমন্ত্রণ করেন স্বামীজিকে । আক্ষরিক অর্থে মিশনারি না হয়েও স্বামীজি বেদান্তবাণীতে মুগ্ধ করেছিলেন চার্চ অফ ইংল্যান্ডের এই ধর্মযাজককে ।

সেসেমি ক্লাব, প্রিন্সেস হল, ওকলে স্ট্রিট, বেলুন সোসাইটি, ভিক্টোরিয়া স্ট্রিট আজও লন্ডনের অভিজাত এবং জ্ঞানীগুণী সমাজেরই পরিচয় বহন করে । স্বামীজির অসাধারণ বাগ্মীতা, জ্ঞান, এবং দর্শন তাদের ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সাইক্লোনের সামনে খড়কুটোর মত ।

নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান

আজকের লন্ডন বহুদেশের বহুভাষার বহু ধর্মের আশ্রয়স্থল । হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, ইহুদি, মুসলিম, ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট নানা ধর্মের মানুষ পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে রয়েছে । নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের এই দেশে ধর্ম কখনও রাজনীতিকে ছেয়ে ফেলেনা বলেই হয়ত মানুষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সদ্ভাবের কোন অভাব নেই ।

সাউথ লন্ডনের একটি ক্যাথলিক বয়েজ হাইস্কুলে আমার শিক্ষকতা । জানুয়ারির এক শীতসকালে একটি ইমেল আসে সরকারি কাউন্সিল থেকে – ক্রয়ডনের সমস্ত স্কুলের সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের আহবান করা হয়েছে স্বামী বিবেকানন্দের ১৫০তম জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে - সঙ্গে রয়েছে তাঁর পরিচয় - আয়োজন করেছেন নানা রকমের সংগঠন কেউ ভারতীয়, কেউ কেনিয়া, কেউ মরিশাস অথবা শ্রীলঙ্কা থেকে । আয়োজিত হয়েছে নানা কার্যক্রমের । ঋগবেদীয় গণিতশাস্ত্র, শাস্ত্রীয় নৃত্য, আয়ূর্বেদী ওষধির, যোগব্যায়াম ছাড়াও বিবেকানন্দের নাটক, প্রদর্শনীও রয়েছে তার মধ্যে ।

এমন ভাবেই দেখা হয়ে গিয়েছিল বিবেকানন্দ সেন্টারের ডিরেক্টর রামচন্দ্র সাহার সঙ্গে – গত দু’দশক ধরে অক্লান্তভাবে স্বামীজিকে অপরিচিত ব্রিটিশ সমাজে মিলিয়ে চলেছেন । বিবেকানন্দ হিউম্যান সেন্টারের অনুষ্ঠান হয়েছিল সারা বছর ধরে । পাঁচ পর্বের এই অনুষ্ঠানগুলিতে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগদান করেছেন বহু সম্মানীয় ব্যক্তি । সারা বিশ্বের রামকৃষ্ণ মিশন থেকে এসেছেন মহারাজরা - স্বামী সুহিতানন্দ, স্বামী অমেয়ানন্দ, স্বামী স্থিরাত্মানন্দ, স্বামী গৌরাঙ্গানন্দ এছাড়াও আরো অনেকে ।

ব্রিটেনের রাণী এলিজাবেথ এবং রাজপরিবারের সদস্যরা স্বামীজির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ডেভিড ক্যামেরন সহ বিভিন্ন এমপিরা, লন্ডনের মেয়র বরিস জনসন এবং আরো অন্যান্য মেয়ররা, বিভিন্ন ধর্মপ্রতিষ্ঠানের ধর্মযাজকেরা, জার্নালিস্ট, গায়ক, লেখক, কবি এরা সকলে নতুন করে জেনেছেন কে এই সন্ন্যাসী, পশ্চিমের আজকের এই সমাজেও তিনি কতখানি প্রাসঙ্গিক ।

বীর জাতীয়তাবাদী সন্ন্যাসী

লাল নীল সবুজের মেলা বসা লন্ডনে স্বামীজির ‘যত মত তত পথ’ শুধু সহনশীলতার কথাই শেখায়না, শেখায় শান্তির কথা- আত্মসম্মানের কথা, আত্মবিশ্বাসের কথা !

বিবেকানন্দ সেন্টারের তরফ থেকে ভারত এবং বাংলাদেশের দুইশত দুস্থ শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয় বিবেকানন্দ স্কলারশিপ ।

দ্বিতীয় পর্বের হাউস অফ কমনসের অনুষ্ঠানে বিবেকানন্দের নামে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেন লন্ডন বেদান্ত সেন্টারের স্বামী দয়াত্মানন্দ । বিশ্ব নামের একটা গ্রাম সেদিন উপস্থিত ছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সভাঘরে । ধরিত্রীর মানচিত্র জুড়ে আঁকা হয় এই গৈরিক বসন পরিহিত আগুনের স্ফুলিঙ্গকে ।

ব্যক্তিগত ভাবে হাজির ছিলাম তৃতীয় পর্বে লন্ডন ইউনিভার্সিটির লোগান হলে । সমবেত হয়েছিলেন কয়েকশো মানুষ । শুধু বিবেকানন্দের নামে এত মানুষের সমাগম বুঝি বিদেশের মাটিতে আর কোথাও হয়নি । উৎসব প্রিয় বিদেশের বাঙালি সেজেগুজে দুর্গাপূজোয় ছাড়া বড় একটা জমায়েত হয়না । তবু এদিন তারা এসেছিলেন । সকাল থেকে সন্ধে অবধি স্বামীজিকে তারা ছুঁয়েছিলেন নানা ভাবে ।

স্বামীজি কি কোন অংশে কখনও বাঙালি ছিলেন ?

এই প্রশ্নটুকু বড় ভাবিয়ে তুলেছিল সেদিন । রেজওয়ানা বন্যা চৌধুরী স্বামীজি এবং তাঁর সমসাময়িক রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর শোনালেন । লন্ডনের মেঘলা নিথর সন্ধ্যা সুরে সুরে মুখরিত হয়ে উঠেছিল । উপস্থিত বাঙালি মনন এই দুই মনস্বী ব্যাক্তিত্ত্বের কথা এবং সুর শুষে নিল সর্বাঙ্গে । প্রচলিত বিশ্বাসে দুই মনীষির এই সম্পর্ক যতই শীতল থাকুক গানে গানে এবং ভাবনায় বাঙালি সেই দিনটিতে বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথকে আত্মীকরণ করে নিয়েছিল ।

সেই লন্ডন শহর, রবি ঠাকুর, বিবেকানন্দ, উইম্বলডনে ভগিনী নিবেদিতার বাড়ি, হয়ত পাশেই রয়েছেন সস্ত্রীক বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বোসও । সবই এক রয়েছে শুধু ঘড়ির কাঁটাটা ঘুরে গিয়েছে একশোর কিছু বেশি বছর । ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ অতলান্তিক তরঙ্গের উপর দিয়ে হেঁটে এসে পথ দেখিয়েছিলেন একদিন– নিশ্চিন্ত নির্ভার ঠাকুর সব দায় অর্পণ করেছিলেন তাঁর নরেন্দ্রকে ।

ইচ্ছাসৃষ্ট বীর জাতীয়তাবাদী সন্ন্যাসী প্রতীচ্যে নিয়ে এসেছিলেন এক নতুন আধ্যাত্মিকতার দর্শন । তাঁর ক্ষত্রিয় সুলভ উগ্রতায় একদিকে যেমন ভেসে গেছে হিন্দুধর্মের জাতপাত সহ বহু অনাচার, অন্যদিকে তেমনই বেদান্ত বর্ণনায় টলে গিয়েছে ইংল্যান্ডের শিক্ষিত সমাজ ।

তারপরে টেমসের জল বয়ে গেছে শতাধিক বছর ধরে, স্বল্পায়ূ মহাপুরুষ বিবেকানন্দকে লন্ডন শহর ভোলেনি । যে বাড়িটিতে তিনি অনেকটা সময় কাটিয়েছিলেন, ব্রিটিশ হেরিটেজের পক্ষ থেকে ৬৩ নম্বর সেন্ট জর্জেস স্ট্রিটের সেই বাড়িটি ২০০৪ সালে সম্মানসূচক নীল ফলকে সম্মানিত করা হয়েছে ।

বিবেকানন্দ হিউম্যান সেন্টার, লন্ডনের অদূরে বোর্ন এন্ডের রামকৃষ্ণ বেদান্ত সেন্টার, ইউরোপের হিন্দু অ্যাকাডেমি, লন্ডনের হিন্দু পরিষদ এবং আরো অনেকে নিশিদিন কাজ করে চলেছেন দেশ থেকে দেশান্তরে ।

আগামী দিনে গ্রীষ্মাবকাশে লন্ডন বেড়াতে আসা বাঙালির গন্তব্য হয়ে উঠুক এই বিবেক তীর্থগুলি এই আশায় বাঁচে টেমসনগরী !

Please Sign in or Create a free account to join the discussion

bullet Comments:

 

 

  Popular this month

 

  More from সুচেতনা

advertisement

PrabashiPost Classifieds



advertisement


advertisement


advertisement