Cookie Policy          New Registration / Members Sign In
PrabashiPost.Com PrabashiPost.Com

ফেলুদা, ব্যোমকেশ এবং...

প্রায় ৮০ বছর হয়ে গেল, বাঙালি এদের কাউকে না কাউকে আঁকড়ে এগিয়ে চলেছে। আধুনিক সময়ে এরা কোথাও খাপ খায় না। অথচ কী ভাবে যেন ঠিকই খাপ খেয়ে গিয়েছে।

Gautam Chowdhury
Mon, Nov 4 2013

About Gautam


More in Culture

Happy Colours of Life

Durga Puja in London: The UnMissables

Mahishasura Mardini

একা বোকা

 
পৃথিবীতে খুব কম গোয়েন্দা আছেন, যিনি প্রেমে পড়েছেন। বিয়ে করেছেন। সাধারণত দেখা যায়, বিয়ে আর সংসার থেকে শত হাত দূরে থাকতেই ভালবাসেন গোয়েন্দারা। শার্লক হোমসের এক বার, মাত্র এক বারই একটি মেয়েকে অন্যরকম মনে হয়েছিল। স্ক্যান্ডাল ইন বোহেমিয়া-এ। ফেলুদার গল্পেও নারী চরিত্র বিরল।

কিন্তু ব্যতিক্রমও আছেন। এই কলকাতাতেই। কেয়াতলায় বাড়ি কিনে যিনি গুছিয়ে বসেছিলেন ছেলে-বউ নিয়ে। নাম? ব্যোমকেশ বক্সী।

ফেলুদা থেকে নারী অনুষঙ্গে একেবারে উল্টো বিশ্বের বাসিন্দা ব্যোমকেশ। কিন্তু বাংলার নিজস্ব ফ্লেভার দুই গোয়েন্দার মধ্যেই সমান ভাবে রয়েছে। বুদ্ধির ধারে তাঁরা কেউ কারও থেকে কম নন। তবে তাঁরাই একমাত্র নন, গত শতক যাঁদের সঙ্গে কাটিয়েছিল বাঙালি। ঘনশ্যাম দাশ, ভজহরি মুখুজ্জেরাও কিন্তু ফেলনা নন।

চেনা গেল না? ঘনাদা, টেনিদা বললে বোধহয় সহজ হতো চেনা। গত শতকে এঁরা কেউ এসেছেন তিরিশের দশকে, কেউ পঞ্চাশে। ফেলুদার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে। ব্যোমকেশের ১৯৩২-এ। টেনিদা, ঘনাদারা এসেছেন এর মধ্যেই।

এঁদের সকলের সঙ্গেই এসেছে সমসময়ের ছবি। ব্যোমকেশের ‘আদিম রিপু’-কে তো স্বচ্ছন্দে বলে দেওয়া যায় ‘পিরিয়ড পিস’। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ভোর সেখানে যেন আলাদা চরিত্র।

তেমনই টেনিদার রকে বসে আড্ডা, ঘনাদার ধোঁয়া ওড়ানো মেসবাড়ি, সবই সময়ের কথা বয়ে বেড়ায়। এমনকী, ফেলুদার আমলের কলকাতাও তাকে সেই সময়ের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। এখনকার থেকে কয়েক দশক দূরের সেই সময়, তার জীবনযাত্রা, অবসরযাপন।

আজ যখন কলকাতার মধ্যবিত্ত পরিবারে (যারা মূলত বাংলার পাঠক) নব্বই ভাগ শিশু ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে যায়, তাদের ভিতরে কতটা সাড়া জাগাতে পারবে এই চরিত্রেরা? ফেলুদা যদিও বা কিছুটা কাছাকাছি হয়, কিন্তু টেনিদা, ঘনাদা বা ব্যোমকেশের জীবনযাত্রা তো এদের থেকে অনেক দূরে! এই যে ছোট্ট গোগোল, সমরেশ বসুর হাত ধরে যে ঢুকে পড়েছে বাংলা কিশোর সাহিত্যে, সে-ই বা কতটা কাছে পৌঁছতে পারবে এখনকার শিশু-কিশোরদের? পরীক্ষায় বারবার গাড্ডা খেয়েও টেনিদা আড্ডা মেরে চলেছে পটলডাঙার রকে। এখনকার কোনও শিশু বা কিশোরের পক্ষে কি এমন কিছু করা সম্ভব? ঘনাদার মেসবাড়ি তো তাদের কাছে মঙ্গলগ্রহের মতো। ব্যোমকেশের মতো ধুতি-পাঞ্জাবি পরা গোয়েন্দা কি হাসির উদ্রেক করবে না? এই তালিকায় বরং বলা যায়, ফেলুদা বা গোগোল, অথবা কাকাবাবুর সঙ্গী সন্তু কিছুটা হলেও এখনকার ছেলেমেয়েদের পরিচিত।

এই অবস্থায় কি টিকে থাকতে পারবে বাংলা সাহিত্যের এই লেজেন্ডারি চরিত্রগুলি?

নিয়মিত যাঁরা আনন্দবাজারের বই সমালোচনার পাতাটি দেখে থাকেন, তাঁরা হয়তো খেয়াল করবেন, গল্প-উপন্যাসের ‘বেস্ট সেলার’ তালিকায় প্রথম দু’টি জায়গা দখল করে থাকে মূলত দু’জন। ফেলুদা এবং ব্যোমকেশ। এটা আজ নতুন নয়। ধারাবাহিক ভাবে চলে আসছে বেশ কিছু বছর ধরে। বাঙালির জটিল মনস্তত্ত্ব যেন এই তালিকার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে। তারা যাপনে আধুনিক হয়েও ছাড়তে পারেনি ধুতি-পাঞ্জাবি পরা স্বাধীনতার আগেকার গোয়েন্দাপ্রবরকে।

শুধু এমন ধারাবাহিকতার ফলেই ব্যোমকেশকে নিয়ে সিনেমা করতে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল একাধিক পরিচালকের মধ্যে। অঞ্জন দত্ত এর মধ্যেই দু’টি ব্যোমকেশ-ফিল্ম করেছেন। বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েও ছবিগুলি চূড়ান্ত জনপ্রিয় হয়েছে। ঋতুপর্ণ ঘোষ মৃত্যুর আগে একটি গল্পের শুটিং শেষ করেছেন। সেটি অঞ্জনের ছবির মতো জনপ্রিয় না হলেও চর্চায় রয়েছে। কার ছবিতে কে ব্যোমকেশ সাজবেন, তা নিয়ে জল্পনা থেকে আলোচনায় জমে গিয়েছে আড্ডা। অন্দরমহলে ঢুকে পড়েছে সত্যবতীও।

ব্যোমকেশ যার সঙ্গে জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় নেমেছে, সে ফেলুদা। প্রদোষচন্দ্র মিত্রের রুপোলি পর্দায় আবির্ভাব ১৯৭৫ সালে। এবং প্রকাশেই বাজিমাত। ‘সোনার কেল্লা’ থেকেই বইয়ের ফেলুদা এবং সিনেমার ফেলুদার সত্ত্বা যেন আলাদা। আলাদা আঙ্গিক। আলাদা মোচড়। আলাদা ফ্লেভার। আনন্দ পাবলিকেশন ফেলুদাকে কমিকসেও নিয়ে এসেছে। বিক্রি হচ্ছে ফেলুদা টি-শার্ট। সম্ভবত বাংলার সব থেকে লগ্নি-বন্ধু চরিত্র, যে আজও বিনিয়োগ ফেরত দেওয়ার একশো শতাংশ আশ্বাস দেয়।

এতটা না হলেও ব্যোমকেশও ধীরে ধীরে সিনেমার হাত ধরে জায়গা করছে নতুন বাঙালির জীবনে। এর থেকে অনেক পিছিয়ে, তবু এগিয়ে আসছে টেনিদা। বই বিক্রি তো আছেই। সঙ্গে প্রকাশিত হচ্ছে কমিকস, যার মাধ্যমে সহজে ধরা যায় কিশোর পাঠককুলকে। দীর্ঘদিন আগে ‘চারমূর্তি’ সিনেমা হয়েছিল। প্রোডাকশন যেমনই হোক, তা আজও জনপ্রিয় শুধু টেনিদা চরিত্রটির জন্য। নতুন করে ঢ্যাঙা, খড়্গনাসা, আদ্যন্ত গুলবাজ টেনিশর্মাকে আরও এক বার বড় পর্দায় আনার চেষ্টাও চলছে।

ঘনাদা আরও খানিকটা পিছনে। তবে ঘনশ্যাম দাশের কমিকসও এখন নিয়মিত ঘটনা। গোয়েন্দা গোগোল সিনেমার মাধ্যমে ফের ঢুকে পড়েছে আমাদের অন্দরমহলে। আর গোয়েন্দা অর্জুন তো এখনও ঘটমান। যেমন ক’দিন আগে পর্যন্ত ছিল কাকাবাবু-সন্তু। এদের জন্য নতুন করে প্ল্যাটফর্ম দরকার নেই। ‘মিশর রহস্য’ হিট করার পরে সেটা প্রমাণও হয়ে গেল।

প্রায় আশি বছর হয়ে গেল, বাঙালি এদের কাউকে না কাউকে আঁকড়ে এগিয়ে চলেছে। আধুনিক সময়ের যাবতীয় উপকরণে এরা কোথাও খাপ খায় না। অথচ কী ভাবে যেন ঠিকই খাপ খেয়ে গিয়েছে।

এর থেকেই স্পষ্ট, যাপনে যতই সমসাময়িক হোক, মনের দিক থেকে বাঙালি বদলায়নি। তাই ঘনাদা, টেনিদা, ফেলুদা বা ব্যোমকেশ, ছিলেন-আছেন-থাকবেন।

Please Sign in or Create a free account to join the discussion

bullet Comments:

 

 

  Popular this month

 

  More from Gautam

PrabashiPost Classifieds



advertisement


advertisement


advertisement