Cookie Policy          New Registration / Members Sign In
PrabashiPost.Com PrabashiPost.Com

ওগো বিদেশিনী

প্রেমে জড়িয়ে রয়েছেন তিনি। অথবা, প্রেমই জড়িয়ে রয়েছে তাঁকে। যেভাবে পাহাড়কে জড়িয়ে থাকে মেঘ।

Gautam Chowdhury
Fri, May 10 2013

About Gautam


More in Culture

Happy Colours of Life

Durga Puja in London: The UnMissables

Mahishasura Mardini

একা বোকা

 
এই কাহিনির শুরু ১৯২৪ সালের নভেম্বরে। বা বলা ভালো, তারও কিছু দিন আগে, যখন জিদ-এর অনুবাদে 'গীতাজ্ঞলী' পড়তে শুরু করলেন ভিকতোরিয়া ওকাম্পো। এবং ধীরে ধীরে জানতে পারলেন তার কবিকে, যাকে এর পরে খুব কাছ থেকে দেখবেন তিনি। মাস দুয়েক ধরে। সেই কবি, যার বয়স তখন ৬৩ বছর। বানপ্রস্থে যাওয়ার বয়স। অথচ তখনও প্রেমে জড়িয়ে রয়েছেন তিনি। অথবা, প্রেমই জড়িয়ে রয়েছে তাঁকে। যেভাবে পাহাড়কে জড়িয়ে থাকে মেঘ। চঞ্চলমতী, কিন্তু পুরোপুরি ছেড়ে যায় না কখনো । বরং তাঁকে জড়িয়ে থেকে বাড়িয়ে তুলেছে তাঁর শোভা।

কী ভাবে ভালোবাসা এড়াবেন কবি, তখনও যে তাঁর লেখা হয়নি ‘শেষের কবিতা’-র মতো পরিপূর্ণ প্রেমের আখ্যানটি। আরও পাঁচ বছর পরে সেই উপন্যাস প্রকাশ পাবে। যেখানে তাঁর লাবণ্য ভালবাসার মানুষকে বর্ণনা করে বলে উঠবে, ‘মিতা, ত্বমসি মম জীবনং, ত্বমসি মম ভূষণং, ত্বমসি মম ভবজলধিরত্নম।‘ যে আখ্যানে প্রেমকে তিনি তুঙ্গে নিয়ে যাবেন একটি অপূর্ব চুম্বন দৃশ্যে।

কী ভাবে ভালোবাসা এড়াবেন কবি, তখনও তো তিনি লেখেননি ‘রক্তকরবী’ । যে নাটকে রঞ্জনের প্রতি নন্দিনীর তীব্র প্রেম, আবার রাজার প্রতি সেই নন্দিনীরই বীতস্পৃহ ভালোবাসা (ইংরেজিতে যাকে বলে লাভ হেট রিলেশন)। লিখবেন কবি,আরও দুবছর পরে।

তত দিনে অবশ্য তিনি লিখে ফেলেছেন অমলের কথা, সুধার কথা। লিখে ফেলেছেন ‘ডাকঘর’ – এর শেষ দৃশ্য, যেখানে সুধা এসে বলে যাচ্ছে ঘুমিয়ে পড়া অমলের প্রতি, ‘সুধা তোমাকে ভোলেনি ।‘

ভুলতে পারেননি ওকাম্পোও । কবির মৃত্যুর খবর যখন তিনি পান, তখন তাঁর গাড়ি বুয়েনোস আইরেস ও মারদেল প্লাতার মাঝামাঝি একটি নির্জন , উন্মুক্ত প্রান্তর চিরে চলে যাওয়া সড়ক দিয়ে ছুঠে যাচ্ছে । রেডিওতে খবর পেলেন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর নেই।

কে রবীন্দ্রনাথ ?

‘তাঁর সাদা চুলে, অসাধারণ প্রকাশ ক্ষমতার অধিকারী দুই চোখে, দীর্ঘ দেহে, মন্থর ও নিশ্চিত পদক্ষেপে, প্রশান্তিতে এবং অচঞ্চল মাধুর্যে তেষট্টি বছরের রবীন্দ্রনাথ ছিলেন চমৎকারী।‘ এ ভাবেই ওকাম্পো বর্ণনা করেছেন তাঁকে । বলেছেন – ‘তিনি যেতে পারেন খুবই আপ্রত্যাশিত, খুবই পরস্পরবিপরীত মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে।‘ জেনেছেন – ‘তিনি মিতবাক, স্নেহপরায়ণ, উদাসীন, পরিহাসপ্রিয় গম্ভীর, আধ্যাত্মিক, খামখেয়ালী, প্রশ্রয় দিতে ওস্তাদ, উৎফুল্ল, কঠিন, কোমল, নৈর্ব্যক্তিক, সুদূর, বিকেকী। আবহাওয়ার মতোই পরিবর্তনশীল।‘

তত দিনে দু’মাস রবীন্দ্রনাথ থেকে ফেলেছেন সান ইসিদ্রোর একটি বাগানবাড়িতে। ওকাম্পো দু’মাস সান্নিধ্য লাভ করেছেন কবির। সেই দু’মাসের বসত শুরু হয়েছিল ১৯২৪ সালের নভেম্বরে । ওকাম্পো যাকে বর্ণনা করেছেন কবির সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় দেখা বলে। প্রথম দেখা? জিদের অনুবাদে ', গীতাজ্ঞলী' পাঠের সময়। নিজের ঘরে নিভৃতে, অবয়বহীন ছিল সেই সাক্ষাৎ । পড়তে পড়তে কেঁদে ভাসিয়েছিলেন তিনি।

বুয়েনোস আইরেসের প্লাজা হোটেলের একটি ঘরে কার্যত বন্দী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সদ্য সেরে ওঠা কবির শরীর যেন সঙ্গ দিচ্ছিল না। মন চাইছিল খোলা বাতাস। হাঁফিয়ে উঠছিলেন তিনি। তখনই তাঁকে ওকাম্পো অনুরোধ করলেন সান ইসিদ্রোয় এসে থাকতে।

বাগানবাড়িতে এসে কী পেয়েছিলেন কবি? পেয়েছিলেন গাছের অনাবিল ছায়া, নদীর বিশালতা এবং টুকরো টুকরো মেঘ। পেয়েছিলেন সেই পাহাড় ঘেরা অঞ্চলে বৃষ্টির গন্ধ। ওকাম্পো এমনই কিছু টুকরো পৃথিবী রেখেছিলেন তাঁর আবহাওয়ার মতো পরিবর্তনশীল কবির জন্য।

এমন প্রিয় কবির বিদায় সংবাদ যখন পেলেন, তিনি তখন ধূ ধূ প্রান্তরে। যেখানে দূরে একটি-দু’টি পাহাড়। চারদিকে বিস্তীর্ণ সমতল। পাখির ডাক। মেঘের মত চরে বেড়ানো গাভীরা। চরাচর বিস্তৃত বিষন্নতা। যে ফাঁকা জায়গা ওকাম্পো নিজে ভালবাসতেন। এবং জানতেন, ভালবাসেন রবীন্দ্রনাথও ।

কবির মৃত্যুর পরে এক লেখায় এসবই বলে গিয়েছেন ওকাম্পো । বলে গিয়েছেন কবিকে বিদায় জানানো তাঁর এই প্রথম নয়। এর আগে ১৯২৫ সালে বুয়েনোস আইরেসের বন্দরে, ১৯৩০ সালে গার দু নর স্টেশনেও তাঁরা একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। চলে গিয়েছেন হাজার হাজার কিলমিটার দূরে, পৃথিবীর দুই প্রান্তে।

তবু একে বিচ্ছেদ বলে মনে হয়নি ওকাম্পোর। ই-মেল, ফেসবুক-হীন এক প্রায়ান্ধকার যোগাযোগ ব্যবস্থার দিনে চিঠি এসেছে, গিয়েছে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে । রবীন্দ্রনাথের বিদেশিনী জায়গা করে নিয়েছেন শান্তিনিকেতনে।

পরবরতীকালে, ‘শেষের কবিতা’ যেন কবির ভালবাসা আর কাব্যপ্রেমের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত হয়ে প্রকাশিত হল। ১৯২৯ সাল। শিলং-এর কেনচেস ট্রেস, যেখানে অমিত ও লাবন্যর গাড়ি দু’টির মধ্যে সংঘর্ষ ঘটিয়েছিলেন কবি, এখনও সে জায়গা বড় বাস্তব। অমিতের মতো কল্পনাপ্রবণ, কবিতা ঠোঁটের গোড়ায় নিয়ে বেড়ানো মানুষকে এক ধীর স্থির ধী শক্তিতে উজ্জ্বল মেয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন তিনি। চরাচর ভরে উঠল ডনের ইংরেজি কবিতা এবং বিদ্যাপতির পদে।

অথচ মেলালেন না শেষমেশ । দূরত্ব এলো অমিত- লাবন্যর মধ্যে । প্রকৃতির দিক থেকে সে বড়জোড়ৃ হাজার দেড়েক কিলোমিটার । কিন্তু মনের দিক থেকে ?

ছেড়ে যাওয়ার সময় লাবন্য বলে গেল, ‘গ্রহণ করেছ যত, ঋণী তত করেছ আমায়।‘

কী আশ্চর্য ! রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে তাঁর স্মরণে লেখা প্রবন্ধে ওকাম্পো বলেছেন, ‘ অনেক দিন ছিলাম প্রতিবেশী, দিয়েছি যত, নিয়েছি তার বেশি।‘

কে তিনি তা হলে? ওকাম্পো? নাকি লাবন্য?

কৃতজ্ঞতা- ১। রবীন্দ্রনাথ ও ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে
২। ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ

Please Sign in or Create a free account to join the discussion

bullet Comments:

 

 

  Popular this month

 

  More from Gautam

PrabashiPost Classifieds



advertisement


advertisement


advertisement