Cookie Policy          New Registration / Members Sign In
PrabashiPost.Com PrabashiPost.Com

বলাই সাহেব

ছোট্ট একটি ঘটনার পর উপলব্ধি করলাম বিল তো রবীন্দ্রনাথের ‘বলাই’-এরই প্রতিরূপ।

Dilip Das
Sun, Sep 14 2014

About Dilip

A public health physician in New Zealand, Dilip Das hails from a village in West Bengal’s Burdwan district. His literary interests include writing ‘belles-lettres’ (রম্য-রচনা) and short stories. He is the Joint Editor of Ankur. Please click here for the latest issue of ‘Ankur’


More in Culture

Happy Colours of Life

Durga Puja in London: The UnMissables

Mahishasura Mardini

একা বোকা

 
বিলের* সাথে আমার দহরম-মহরম চার বছরেরও বেশি সময়ের। সে যখন আমাদের বাড়িতে প্রথম আসতে শুরু করল তখন ভাল করে বসতেও শেখেনি। তারপর এই ক’টা বছরের মধ্যে সে হয়ে উঠেছে বছর পাঁচেকের একটা প্রাণোচ্ছল বালক। সে আর তার সঙ্গীসাথীরা আমাদের বাড়িটিকে করে রেখেছে কলহাস্যে মুখরিত, আনন্দে পরিপূর্ণ। এখন তার আমাদের বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় হল। এদেশে ষোলো-আঠারো বছরের ছেলে-মেয়েরা যখন বাবা-মায়ের আশ্রয় ছেড়ে বৃহত্তর জীবন ও জগতের আঙ্গিনায় পা দেয় তখন অথবা দেশে মেয়েদের বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ি যাবার সময় বাবা-মায়ের মনে যে একটা ‘পাখি-বাসা-ছেড়ে-যাওয়া-শূণ্যতা’র অনুভূতি হয়, আমার মনে এখন ঠিক সেই একই অনুভূতি। অথচ সে হিসাবে বিল আমার কেউই নয়। সে আমার স্ত্রীর শিশুশিক্ষা ও পরিচর্যা ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী একটি শিশু।

নিউজিল্যান্ডে শিশুর পরিচর্যা এবং শিক্ষার, বিশেষ করে প্রাক-বিদ্যালয় শিক্ষার উপর খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রাক্‌-বিদ্যালয় শিক্ষা মানে মূলত খেলাধূলা, ছড়া-নাচ-গান, ছবি আঁকা ইত্যাদির মাধ্যমে শিশুর সার্বিক বিকাশ সাধন। তার জন্য সরকারি-বেসরকারি হরেক রকম ব্যবস্থা আছে। যেহেতু এদেশে বেশির ভাগ বাবা-মা দুজনেই বাড়ির বাইরে কাজ করেন এবং যৌথপরিবারের চল খুবই কম, তাই ছোট বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র (creche) হল এরকম একটি ব্যবস্থা। অনেক কেন্দ্রে এক দু মাস বয়স থেকেই শিশুদের রাখার ব্যবস্থা থাকে। অন্য একটি ব্যবস্থা হল কিন্ডারগার্টেন। সরকারি ব্যবস্থাপনার এই কেন্দ্রগুলিতে বাচ্চারা সাধারণত তিন/সাড়ে তিন বছর বয়স থেকে যেতে শুরু করে। এই কেন্দ্রগুলি ছাড়াও অনেক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মহিলা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজেদের বাড়ীতে গুটিকয়েক শিশুর রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচর্যা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। অনেক সময় তাঁরা শিশুকল্যাণে নিয়োজিত কোন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে শিশু পরিচর্যার কাজটি করে থাকেন। এই রকম একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হল Barnardos NZ। এদের নিজেদের শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র আছে, আবার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগীদের মাধ্যমেও সংস্থাটি এই কাজ করে থাকে। দ্বিতীয় ব্যবস্থাটিতে বাচ্চারা অনেক বেশী ব্যক্তিগত মনযোগ পাবার সুযোগ পায়। তাই অনেক মা-বাবাই বাচ্চাকে creche এ না রেখে ব্যক্তিগত উদ্যোগীদের তত্বাবধানে রাখতে পছন্দ করেন। আমার স্ত্রী Barnardos NZ এর সাথে চুক্তিবদ্ধ এরকম একজন শিশুশিক্ষা কর্মী।

যাইহোক, আবার বিলের কথায় ফিরে আসি। আমার গৃহিণীর তত্ত্বাবধানে থাকা আরো দু-তিনটি বাচ্চার সাথে বিল খুব সহজেই খাপ খাইয়ে নিল। দেখতে দেখতে প্রথমে হামাগুড়ি এবং তারপর টালমাটাল পায়ে হাঁটতে শুরু করল। কথা ফোটার পর প্রথম প্রথম সে আমাকে ডাকত ‘বিপ’ বলে। তার পর সেটা ‘ডীপে’ উন্নীত হল। আরো পরে ‘ডিলীপ’ এ এবং সবশেষে ‘আঙ্কল ডিলীপ’এ আমি প্রমোশন পেলাম ! বিলের চেয়ে কয়েক মাসের বড় ‘কেট’* নামে একটি মেয়ে ছিল আমার স্ত্রীর তত্ত্বাবধানে। ওরা যখন আর একটু বড় হয়েছে, কলম দিয়ে কাগজে আঁকিবুকি কাটতে শিখেছে, তখন আমার কাছে আসত ‘ছবি আঁকা’র জন্য কাগজ নিতে। আমি অনেক সময়ই আমার পড়ার ঘরে বসে বাড়ি থেকেই কাজ করতাম। তাই এই বাচ্চাগুলিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। আমার সাথে ওদের বেশ ভাব হয়ে যায়। ওরা যখন আমার কাছে কাগজ নিতে আসত তখন আমি ওদের আস্তে আস্তে একটি দুটি বাংলা ছড়া শেখাতে শুরু করি। বিল আর কেট খুব অল্পদিনের মধ্যে ‘আমরা দুটি ভাই শিবের গাজন গাই, ঠাকুমা গেছে গয়া কাশী ডুগডুগি বাজাই’ ছড়াটি রপ্ত করে নিল। একসময় এমন হল যে আমি ‘ঠাকুমা’ বললেই বিল ‘আমরা ডুটি ভাই’ বলতে শুরু করে দিত। আর যদি ছড়া বলার মুডে না থাকত তবে বলত ‘নো থাকুমা’। এই ছড়াটি ছাড়াও ওকে আমি ‘আতা গাছে তোতা পাখী ডালিম গাছে মৌ, এত ডাকি তবু কথা কয় না কেন বৌ’ ছড়াটি শিখিয়েছিলাম। আধো আধো সাহেবি উচ্চারণে ওর গলায় ছড়া দুটি শুনতে খুব ভাল লাগত। বাঙালি বাবা-মায়েরা তাদের ছোট ছেলেমেয়েরা ‘টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার’ আর ‘ব্যা ব্যা ব্ল্যাক শিপ’ বলতে শিখলে একপ্রকার আত্মপ্রসাদ অনুভব করেন। কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছেলেমেয়েরা সেগুলি আবৃত্তি করলে দেখেছি বাবামায়েদের মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। বিল আর কেট যখন নেচে হাত নেড়ে বাংলা ছড়া দুটি বলত তখন আমিও একপ্রকার বিমলানন্দ অনুভব করতাম। ইচ্ছে ছিল আমাদের দুর্গাপূজোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিলকে দিয়ে ছড়া দুটো আবৃত্তি করাব। কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। সে কথায় পরে আসছি।

এদিকে বিল আর কেটের বয়স প্রায় পাঁচ বছর হতে চলল। এদেশে বাচ্চাদের বয়স ছ’ বছর পূর্ণ হলে ইস্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক। তবে পাঁচ পেরিয়ে ছয়ে পা দিলেই প্রাইমারি স্কুলে যাওয়া শুরু করা যায় এবং বেশিরভাগ বাচ্চাই তা করে। কেট অবশ্য সাড়ে তিন বছর বয়স থেকে দিনের অর্ধেকটা সময় কিন্ডারগার্টেনে যেত। বাকি অর্ধেকটা দিন আমাদের বাড়িতে থাকত। বিল কিন্ডারগার্টেনে যায়নি, পুরো সময়টাই আমার গৃহিণীর ‘পাঠশালায়’ থেকেছে। দেখেছি কি উৎসাহ নিয়ে ছেলেমেয়েরা স্কুল শুরু করার দিনটির জন্য অপেক্ষা করে থাকে। এর আগে জ্যাক* এবং জিল* নামে একজোড়া পিঠোপিঠি ভাইবোন আমাদের বাড়িতে আসত। জ্যাক স্কুল যাওয়া শুরু করার পর জিলের বয়স যখন পাঁচের কাছাকাছি এল তখন দুই ভাইবোনে দিন গুনত আর ক’দিন বাকি আছে জিলের স্কুল শুরু করতে। হাঁটতে বেড়িয়ে ওদের সাথে রাস্তায় দেখা হলে জ্যাক প্রথমেই আমাকে জানিয়ে দিত আর ক’দিন বাকি আছে। খুব কাছ থেকে এই প্রাণচঞ্চল বাচ্চাগুলিকে দেখে উপলব্ধি করেছি এদের আনুষ্ঠানিক বিদ্যারম্ভ কত স্বাভাবিক, কত আনন্দময়। ‘ভালো স্কুলে’ ভর্তির জন্য মা-বাবার দুশিন্তা নেই, ভর্তির পরীক্ষার জন্য বাচ্চাকে ‘তোতাপাখি’ বানানোর প্রয়োজন হয় না। একবার কি হয়েছে, বিল পাঁচের সাথে পাঁচ যোগ করতে শিখেছে আর সেই নবলব্ধ বিদ্যাটি বাড়িতে মা-বাবার কাছে জাহির করেছে। তাতে মা-বাবা অখুশি। তাঁরা চান না পাঁচ বছর বয়স পূর্ণ হবার আগেই ছেলে পাঁচ আর পাঁচে যোগ করতে শিখে বয়সের তুলনায় এগিয়ে যাক ! ভাবটা হল যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ তো শিখবেই – তার জন্য এত তাড়া কিসের? স্কুলে শেখানোর আগেই শিখে গেলে স্কুলে যখন এগুলো শেখাবে তখন আর তার শেখার ঔৎসুক্য থাকবে না।

একদিন আমাদের বাড়িতে পৌঁছে বিলের মুখ ভার। সে কারো সাথে ভাল করে কথা কয় না, তার খুব মন খারাপ। একটু অনুসন্ধান করে গৃহিণী কারণটি জানতে পারলেন। তা হল আমাদের বাগানের কিছু আধ-শুকনো ফুলগাছের অন্তর্ধান। আমরা বাড়ির সামনেটায় বেশ কিছু ডালিয়া গাছ লাগিয়েছিলাম। গ্রীষ্মকালে বাগান আলো করে তাদের ফুল ফুটে থাকত। তারপর যখন ঠান্ডা পড়তে শুরু করল তখন প্রথমে ফুলগুলি এবং পরে গাছগুলি আস্তে আস্তে শুকিয়ে যেতে লাগল। এক ছুটির দিনে ঐ আধ-শুকনো গাছগুলিকে কেটে ফেলে বাগানটিকে পরিষ্কার করলাম। পরদিন সেটা দেখেই বিলের মন খারাপ। আর যখন জানল যে আমি এই কর্মটি করেছি তখন তার প্রতিক্রিয়া হল, ‘আঙ্কল ডিলীপ ইজ ভেরি নটি’। তারপর থেকে সে আমার সাথে কথা বলতে চায় না, ছড়া বলা তো দূরের কথা।

ছোট্ট এই ঘটনাটির পর উপলব্ধি করলাম যে বিল তো রবীন্দ্রনাথের ‘বলাই’-এরই প্রতিরূপ। আপনাদের তার কথা হয়তো জানা আছে। ‘বলাই’ গল্পে** রবীন্দ্রনাথের ভাইপো হল বলাই। কাকার বাগানের আপামর গাছপালা এমন কি আগাছার সাথেও তার খুব বন্ধুত্ব। বাগানের রাস্তার মাঝে গজিয়ে ওঠা (লেখকের ভাষায় নির্লজ্জভাবে) শিমুলগাছটি তার প্রাণের দোসর। এক সময় উন্নততর শিক্ষালাভের জন্য কাকিমার কোল ছেড়ে মাতৃহীন বলাইকে দূরে যেতে হল। সে কিন্তু কাকিমাকে চিঠি লিখে বন্ধু শিমুল গাছটির খবর নেয়, তার ফটো পাঠাতে বলে। একদিন তার অনুপস্থিতির সুযোগে কাকা ঐ গাছটিকে দিলেন কেটে। তার ফলশ্রুতি হল কাকিমার দুদিন অন্নজল ত্যাগ এবং কাকার সাথে দীর্ঘদিন বাক্যালাপ বন্ধ।

গাছপালার সাথে বিলের এই আত্মীয়তা আগে তেমনভাবে খেয়াল করিনি। এখন পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি গাছপালার ব্যাপারে সে ছিল অন্য ছেলেমেয়েদের থেকে আলাদা। অন্যরা বাগানের গাছ থেকে ফুল তুললে, পাতা ছিঁড়লেও বিল কোন দিন কোন গাছে হাত দিত না। আমার বাগান পরিষ্কারের উৎসাহ তার শিশু মনে জোর আঘাত দিল। সে আর আমার কাছে ছড়া বলতে চায় না!

এই ছেলেমেয়েরা ‘হাপি লাস্ট ডে’র পর যখন গৃহিণীর পাঠশালায় আর আসে না তখন সাময়িক একটা শূণ্যতা অনুভব করলেও নতুন বাচ্চা পাঠশালায় যোগ দিয়ে সেই শূণ্যতা পূরণ করে দেয়। তাছাড়া এইসব ছেলেমেয়েদের অনেকেই আমাদের পাড়ায় থাকে, আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে দলবেঁধে হৈ হৈ করতে করতে স্কুলে যায়। সুতরাং মাঝে মাঝেই তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়। এই বিল সাহেবও (বলা ভাল – বলাই সাহেবও) আমাদের পাড়ায় থাকে। সে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়েই স্কুলে যাবে। নতুন পরিবেশে, নতুন বন্ধুদের সাহচর্যে আর নতুন অভিজ্ঞতার আনন্দে আমাদের বাগানের আধ-শুকনো গাছবন্ধুদের হারানোর স্মৃতি সে খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যাবে আশা করি।

_____________________
* আসল নাম নয়।
**এখন ইন্টারনেটে সমগ্র রবীন্দ্ররচনাবলী পড়া যায়। রবীন্দ্রনাথের ‘বলাই’ গল্পের ওয়েবপেজ হল - http://www.rabindra-rachanabali.nltr.org/node/2020

Please Sign in or Create a free account to join the discussion

bullet Comments:

 

 

  Popular this month

 

  More from Dilip

PrabashiPost Classifieds



advertisement


advertisement


advertisement